তালসারি১ - তালসারি২ - তালসারি৩
তালসারি১_তালসারি২_তালসারি৩
অমিতাভ_ব্যানার্জী
তালসারি যখন প্ৰথম যাই সেটা মোটামুটি ছিয়ানব্বই সাল নাগাদ। দুই বন্ধু চাকরি পেয়েছি। ঠিক করলাম দিঘা যাবো। দুজনেরই মায়েরা প্রতিজ্ঞা করালো, সমুদ্রে স্নান হবে না। ঠিক হ্যায় কোই বাত নেহি।
প্রথম দুদিন তো সমুদ্র দেখা আর পান ভোজনেই কেটে গেল। তৃতীয় রাতে মনে হলো এভাবে হবে না। একটা হোটেলের ছেলেকে জিজ্ঞেস করায় সে জানালো তার দেশের বাড়ি উড়িষ্যার(তখনো ওডিসা হয় নি) চন্দনেশ্বর, ওর কাছেই আছে তালসারি বলে একটা জায়গা, সমুদ্র কিন্তু সমুদ্র নয়! গেলে ভালো লাগবে। রিকশা বা ভ্যানে খুব বেশি হলে ঘন্টাখানেক।
পরদিন সকাল সাতটা নাগাদ রিকশার সাথে কথা হলো, জানলাম ছয় কিমি দূরত্ব। ছেলেটি বললো ওখানে আর কত দেখবেন? আপনাদের চন্দনেশ্বর আর লক্ষিনারায়ন মন্দির দেখিয়ে দেব। ভাবলাম যাক ঠকে গেলে কিছু তো দেখার জন্য হাতে রইলো। বেরিয়ে পড়লাম দুজনে। যাচ্ছি তো যাচ্ছিই, মাঝে উড়িষ্যার বর্ডার পড়লো, একটু পুলকিত হলাম, একই সাথে অন্য রাজ্যেও ঘোরা হয়ে যাচ্ছে বলে। রাস্তায় একবার লক্ষিনারায়ন মন্দির আর আরেকবার চন্দনেশ্বর মন্দির দূর থেকে দেখিয়ে রিকশাচালক বললো ফেরার পথে দেখিয়ে দেব। রাস্তা আর শেষ হয় না, গ্রামের ভেতর দিয়ে, পান বরজের মধ্যে দিয়ে, ক্ষেতের মাঝ দিয়ে রাস্তা চলছে তো চলছেই, ভাঙাচোরা রাস্তার ঝাকুনিতে প্রাণ ওষ্ঠাগত। অবশেষে পৌঁছলাম এক বিস্তীর্ণ জলরাশির কাছে। প্রথম দর্শনে মনে হলো যেন একটা জলরঙা ছবি আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে। রিকশা থেকে নেমেই ছবি তোলা শুরু। রিকশাচালক বললো, দাদা রিল শেষ করবেন না, ওদিকে অনেক দেখার আছে, আমি এই গাছের ছায়ায় বসছি আপনারা ঘুরে আসুন, এখানে কিছুই পাবেন না, নিউ দিঘায় ফিরে খাবার পাবেন, নয়তো চন্দনেশ্বরে খেতে পারেন তবে পছন্দ নাও হতে পারে। তখন সকাল আটটা, ভালো প্রাতরাশ করে বেড়িয়েছি, খাওয়ার চিন্তা কে করে?
একটু এগিয়ে দেখলাম রাস্তার ডানদিকে কয়েকটি কুঁড়ে, বাদিকে একটি একচালা চায়ের দোকান আর একটি লোক কিছু বাদাম, পাপরি ইত্যাদি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, তার পিছনে একটা ফাঁকা ফাঁকা জঙ্গলের মত জায়গায় একটি নির্মিয়মান একতলা বিল্ডিং, জানলাম এটি ভবিষ্যতে সরকারি গেস্টহাউস হবে। চায়ের দোকানে কয়েকটি লোক চা খাচ্ছে, কয়েকটি বাচ্চা ওই বাদামওয়ালার চারিদিকে ঘুর ঘুর করছে। গলা তখন শুকিয়ে গেছে, সাথে থাকা জল খেতেই, চায়ের নেশা জাগলো। নিলাম, এক চুমুক দিয়ে বুঝলাম এটা যে চা সেটা আগে বলে দিতে হবে। এরপর আর অপেক্ষা না করে জলের দিকে এগিয়ে গেলাম, সাদা মিহি বালির তট, অনেকটা যেন নদীর পাড়। চড়া রোদ উঠেছে, তটের ওপর অনেকগুলো কালো কালো নৌকো উল্টে রাখা আছে, তাতে কিছু লোক কাজ করছে, কিছু ওই নৌকার আড়ালে বসে তাস খেলছে। জলরাশি যথেষ্ট স্থির, প্রায় লেকের মত, দুদিকে দিগন্তরেখা, দিঘার দিকে বিশাল সমুদ্র, কিন্তু সোজাসুজি উলটো দিকে মোটামুটি এক কিমির কম দূরত্বে একটা তট, বিস্ময়ে লক্ষ করলাম ওই তটের রংটা লাল। লোকেদের জিজ্ঞেশ করতে উড়িয়া টানে বললো, গিয়েই দেখো। জানতে চাইলাম কি করে যাবো এত জল, বললো নৌকো আসছে, এলে যাবে।
দেখলাম একটা নৌকো এদিকেই আসছে। ইতিমধ্যে এক নববিবাহিত দম্পতি ওখানে এসে উপস্থিত, নৌকো দেখে ওরাও এগিয়ে গেছেন, দরাদরি শুরু হতে স্থির হলো আমরা চারজনই একসাথে গেলে ভাড়াটা আয়ত্তের মধ্যে থাকবে। কথা হলো সমুদ্রও ঘুরিয়ে দেবে। নৌকাটা ছোট, দুজন চালাচ্ছে, একজন দাঁড় টানছে, একজন হাল ধরে আছে। সন্দেহ হলো এই নৌকো সমুদ্রে যাবে তো? নৌকো দুলতে দুলতে এগিয়ে চললো লাল তটের দিকে, বহুদিন পর নৌকো চড়েছি, একটু যে ভয় ভয় করছে তা নয়, দুজনেই তো সাঁতার জানিনা! যাই হোক দশ মিনিটেই ওপারে পৌঁছলাম। কিন্তু যত কাছে যাচ্ছি তটটা সাদা লাগছে, কি হলো ব্যাপারটা? যার জন্য এলাম সেই লাল রঙ কই? ভেজা বালিতে নামতেই বুঝলাম একটু দূরে শুকনো বালিটা লাল। চারজনে এগোতেই বোধগম্য হলো ব্যাপারটা। ওগুলো লাল কাঁকড়া, অসংখ্য, অগুনতি, যেন একটা লাল চাদর বিছানো, ওরা রোদ পোহাচ্ছে। আমরা যত এগোই তত ওরা গর্তে ঢুকে যায় আর আমাদের চারপাশের কিছুটা অঞ্চল সাদা বালি হয়ে যাচ্ছে। পেছন দিকে আবার সেই লাল। সামনে, পেছনে, দুধারে শুধু লাল। আমদের চারজন কে ঘিরে একটা ছোট্ট সাদা বালির দ্বীপ আর তার চারিদিকে লাল রঙ। মনে হচ্ছে স্বপ্ন দেখছি। কিছুক্ষন পর ধাতস্থ হতে দেখি একটু দূরে কিছু বাচ্চা খেলা করছে। একটু এগোতে দেখি কয়েকজন মাটিতে উবু হয়ে বসে কি করছে। কাছে যেতে বুঝলাম কাঁকড়া ধরছে। একটা কাঠি গর্ত দিয়ে ঢুকিয়ে রেখে দিচ্ছে, কয়েক মিনিট পর খুব আসতে আসতে তুলছে, কাঠির ডগায় একটা কাঁকড়া, খপ করে ধরে কয়েকটা ঢাকনা ওয়ালা ছোট্ট ঝুড়িতে ভরে ফেলছে। ওদেরকে দেখে আমরাও চেষ্টা করলাম। ধুস্ ! কাঁকরাগুলো বোধহয় চেনা লোক ছাড়া ধরা দেয় না। তবু আমাদের সাথের ভদ্রলোকের অনুরোধে ওরা একটাকে ওনার হাতের তালুতে রাখলো। ভালো করে দেখলাম, ছবিও তুললাম। আরো একটু এদিক ওদিক ঘুরতে ঘুরতে, থুড়ি ওই লাল কাঁকড়া তাড়াতে তাড়াতে দেখলাম অনেক বড় বড় কাছিম জল থেকে উঠে এসে রোড পোহাচ্ছে, আমরা এগোতেই ওগুলো প্রায় সব জলে নেবে গেল, শুধু একটা রয়ে গেল, উৎসাহ ভরে এগিয়ে গিয়ে দেখি ওটি মরা আর উল্টানো, বাচ্চাগুলো আমাদের সাথে সাথেই প্রায় আসছিল, ওরাই উড়িয়াতে বললো, ওভাবেই ওরা কাছিমগুলোকে উল্টে রাখে, তারপর পরে নিয়ে যায়, তবে ওই দিনে একটা দুটোর বেশি নয়। কেন জিজ্ঞেস করায় বললো, তার বেশি হলে যদি কাছিম আর না আসে তাই। ওদের পরিমিত ভাবে প্রকৃতির সম্পদ আরোহনের ভাবনা আমাদের অবাক করলো।
এবার সমুদ্রে যাবার পালা। নৌকোয় উঠতেই তা দিঘার দিকে ভেসে চললো। কিছু দূর অবধি আগের মতোই অল্প দুলুনি, সামনে নীলচে ধূসর অসীম জলরাশি। কিছুটা এগোতেই ঢেউয়ের উপলব্ধি হলো। প্রথমে দুলুনি বাড়ল, তারপর আরো কিছুটা এগোতেই নৌকো যেন মোচার খোল হয়ে গেল। সে কি দুলুনি। অত ছোট্ট নৌকা সমুদ্রের মাঝে! তাতে আমরা! নাগরদোলা কে মনে হচ্ছিল শিশু। এর মধ্যে বেশ হাওয়া উঠলো, অবস্থা সঙ্গীন। হাওয়া আর ঢেউয়ের শব্দে কথাই শোনা যাচ্ছে না। আমাদের তো ভয় প্রাণ ওষ্ঠাগত। মাঝি দুজন দেখলাম নির্বিকার। কে জানে বাবা এদের কি বোধ নেই নাকি! এর মধ্যেই হাতের ইশারায় দূরে নিউ দিঘার তট দেখালো আমাদের। কত লোক স্নান করছে, সব ছোট্ট ছোট্ট দেখা যাচ্ছে। সবচেয়ে দূরে যারা এগিয়ে এসেছে তাদের থেকেও আমরা বোধহয় অনন্ত দু-তিন কিমি দূরে নৌকায় রয়েছি। তার থেকেও কিছু এগিয়ে ওল্ড দিঘার পাথর গুলো দেখা গেল। ওপরের বাড়ি গুলো মনে হচ্ছে ঝুলনের খেলনার থেকেও ছোট। তখন আমাদের মনে হচ্ছে, ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি। কোনমতে আমাদের অনুরোধ আর ওই নববিবাহিত মহিলাটির কান্নায় তারা অনিচ্ছা সত্ত্বেও ফিরতে শুরু করলো। বললো আর একটু এগোলে নাকি দিঘা মোহনাও দেখিয়ে দিত। আমরা তখন পারলে উড়ে ফিরে আসি।
অবশেষে আবার সেই তালসারির বালু তটে এসে পৌঁছলাম। নেমেই ধাতস্থ হবার জন্য ওই চায়ের দোকানে এসে বসলাম। ইতিমধ্যে মেঘ করে ঝিরি ঝিরি বৃষ্টিও শুরু হয়েছে। ভাগ্যিস আমরা জোর করে ফিরেছি, ওই খোলা নৌকোয় সমুদ্রের মাঝে থাকা অবস্থায় জোরে বৃষ্টি নামলে হয়েছিল আরকি। অবশ্য ঘড়ি দেখে বুঝলাম মাত্র আধঘন্টা আমরা সমুদ্রে ছিলাম, তার বেশির ভাগটাই প্রায় শান্ত অংশে। দোকানে তখন এক জনই খদ্দের ছিলেন। বাংলা বলতে পারেন, মনে হলো শিক্ষিত। তার কাছে জায়গাটার সম্বন্ধে জানলাম যে এটি হলো সুবর্নরেখা নদীর বদ্বীপের পূর্বদিকের অন্তিম অংশ। ওই সামনের তটটি তার বদ্বীপের চড়া। আর দিঘার উল্টোদিকে মানে পশ্চিম দিকে সুবর্নরেখার মোহনা। তাই এটা ঠিক সমুদ্রও নয় আবার নদীও নয়, আসলে এটা একটা খারি। তাই বোধহয় হোটেলের ছেলেটি বলেছিল, সমুদ্র কিন্তু সমুদ্র নয়। আর একটা ব্যাপার জেনে ভীষন লোভ হয়েছিল রাতে থাকতে। জানলাম রাতে ভাটার সময় খারিতে জল এত কম থাকে যে শেয়ালরা একটি বিশেষ অংশ দিয়ে ওই উল্টোদিকের তটে যায় কাঁকড়া খেতে, ওখানকার লোক চাঁদের আলোয় ওই শেয়ালদের পিছু নিয়ে ওপারে যায় কাঁকড়া ধরতে, আমরা যদি রাতে কোথাও থেকে যাই তবে আমরাও যেতে পারবো। খুব লোভ হয়েছিল, কিন্তু থাকার জায়গার অভাবে সাহস করে উঠতে পারলামনা।
ফেরার পথে চন্দনেশ্বরের মন্দির দর্শন করে আবার আসার আশা নিয়ে চলে এলাম।
পথে বন্ধুকে বললাম, মায়েদের কাছে প্রতিজ্ঞা তো মিথ্যে হয়ে গেল। সে উত্তর দিলো, কি করে? আমরা কি জলে নেমেছি? আমাদের সমুদ্রে না নামতে দিব্যি দিয়েছে, নৌকা চরতে তো বারন করেনি!
দ্বিতীয়বার আমি উদ্যোগী হয়ে নিউ দিঘা থেকে দুটি রিকশায় করে মা বাবা স্ত্রী ও শিশুকন্যাকে নিয়ে তালসারি যাই তিন সালে। দেখলাম ওই কুঁড়ে গুলো নেই, দোকানটা একটু বড় হয়েছে, নির্মিয়মান গেস্ট হাউসটি ভগ্নপ্রায়। কুঁড়ে গুলোর জায়গায় একটা প্রচন্ড বিশ্রী পচা মাছের গন্ধ বার হওয়া একটি কারখানা। কৌতুহল বসত ভেতরে গিয়ে দেখি ওটি একটি সমুদ্রজাত প্রাণী থেকে পোল্ট্রির খাদ্য প্রক্রিয়াকরণের উদ্যোগ। তটে বেশি নৌকো নেই। উল্টোদিকের তটের রঙও সাদা। দূরে কিছু জেলে জাল কাঁধে সারি দিয়ে ওই খারি হেঁটে পার হচ্ছে দেখে আমার ষাটোর্ধ বাবা তরুণের মত দৌড়ে গেলেন তাদের উদ্দেশ্যে। কিন্তু ভগ্ন হৃদয়ে ফিরে এসে জানালেন, মাছের খোঁজে গেছিলেন, কিন্তু ওরা যাচ্ছে ওই তটে জাল শুকোতে। ওই অংশে জল হাঁটুর নিচেই ছিল। হয়তো ঐটাই সেই শেয়াল পার হবার রাস্তা। নাঃ এবার আর নৌকা চড়ার সুযোগ বা ইচ্ছে কোনোটাই হয়নি। জানলাম উড়িষ্যার সেই প্রচন্ড ঘূর্ণি ঝড়ে এই জায়গাটা প্রায় ধংস স্তূপে পরিণত হয়েছিল। তারপর থেকে খারির জলও কমে গেছে। মনটা বেশ খারাপ হয়ে গেল। ওই কারখানা থেকে আসা গন্ধের জ্বালায় আর থাকতেও ইচ্ছে করল না। দেখলাম আরো কিছু ভ্রমনার্থী এসেছে, কিন্তু তাদের মধ্যে যেন সেই উৎসাহ নেই। হয়তো ওদেরও পরিবেশটা আকর্ষণ করছে না।
তৃতীয়বার যাই এগারো সালে গাড়িতে করে আরো দুই বন্ধু পরিবার নিয়ে তাদেরই উৎসাহে। রাস্তায় লক্ষ্য করলাম পথের দুধারে দুই রাজ্যের মোবাইল টাওয়ার ধরছে। একটু উড়িষ্যার দিকে গেলেই রোমিং হয়ে যাচ্ছে। যখন পৌঁছলাম জায়গাটা চিনতেই পারলাম না। ওই কারখানা, দোকান, ভগ্ন গেস্টহাউস কিছুই নেই। খারিতে জল প্রায় নেই বললেই চলে। এদিকের তটে একটা বেশ বড় কংক্রিটের সামিয়ানা নির্মিত হয়েছে। তাতে অনেকগুলো মোটরসাইকেল রাখা আছে। প্রচুর লোক ওই গাড়িগুলো ভাড়া করে তটের ওপর বিকট আওয়াজ করে চালিয়ে কি মজা পাচ্ছে কে জানে! চলে আসতে ইচ্ছে করছিল। কিন্তু বন্ধুদের চাপে ওই নালার মত খারি হেঁটে পার হয়ে ওপারের তটে গেলাম। জায়গাটা থেকে পচা মাছের বিশ্রী গন্ধ আসছে। এগিয়ে গিয়ে দেখি বিস্তীর্ণ জায়গা জুড়ে মাছ শুকোনো হচ্ছে। জানলাম লাল কাঁকড়া বা কাছিম আর বিশেষ দেখা যায় না। অঞ্চলটা এত নোংরা যে বিরক্ত হয়ে জোর করেই ফিরে চললাম। ঠিক করেছি এই শেষ, আর যাবো না।
(#অমিতাভ)
অমিতাভ_ব্যানার্জী
তালসারি যখন প্ৰথম যাই সেটা মোটামুটি ছিয়ানব্বই সাল নাগাদ। দুই বন্ধু চাকরি পেয়েছি। ঠিক করলাম দিঘা যাবো। দুজনেরই মায়েরা প্রতিজ্ঞা করালো, সমুদ্রে স্নান হবে না। ঠিক হ্যায় কোই বাত নেহি।
প্রথম দুদিন তো সমুদ্র দেখা আর পান ভোজনেই কেটে গেল। তৃতীয় রাতে মনে হলো এভাবে হবে না। একটা হোটেলের ছেলেকে জিজ্ঞেস করায় সে জানালো তার দেশের বাড়ি উড়িষ্যার(তখনো ওডিসা হয় নি) চন্দনেশ্বর, ওর কাছেই আছে তালসারি বলে একটা জায়গা, সমুদ্র কিন্তু সমুদ্র নয়! গেলে ভালো লাগবে। রিকশা বা ভ্যানে খুব বেশি হলে ঘন্টাখানেক।
পরদিন সকাল সাতটা নাগাদ রিকশার সাথে কথা হলো, জানলাম ছয় কিমি দূরত্ব। ছেলেটি বললো ওখানে আর কত দেখবেন? আপনাদের চন্দনেশ্বর আর লক্ষিনারায়ন মন্দির দেখিয়ে দেব। ভাবলাম যাক ঠকে গেলে কিছু তো দেখার জন্য হাতে রইলো। বেরিয়ে পড়লাম দুজনে। যাচ্ছি তো যাচ্ছিই, মাঝে উড়িষ্যার বর্ডার পড়লো, একটু পুলকিত হলাম, একই সাথে অন্য রাজ্যেও ঘোরা হয়ে যাচ্ছে বলে। রাস্তায় একবার লক্ষিনারায়ন মন্দির আর আরেকবার চন্দনেশ্বর মন্দির দূর থেকে দেখিয়ে রিকশাচালক বললো ফেরার পথে দেখিয়ে দেব। রাস্তা আর শেষ হয় না, গ্রামের ভেতর দিয়ে, পান বরজের মধ্যে দিয়ে, ক্ষেতের মাঝ দিয়ে রাস্তা চলছে তো চলছেই, ভাঙাচোরা রাস্তার ঝাকুনিতে প্রাণ ওষ্ঠাগত। অবশেষে পৌঁছলাম এক বিস্তীর্ণ জলরাশির কাছে। প্রথম দর্শনে মনে হলো যেন একটা জলরঙা ছবি আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে। রিকশা থেকে নেমেই ছবি তোলা শুরু। রিকশাচালক বললো, দাদা রিল শেষ করবেন না, ওদিকে অনেক দেখার আছে, আমি এই গাছের ছায়ায় বসছি আপনারা ঘুরে আসুন, এখানে কিছুই পাবেন না, নিউ দিঘায় ফিরে খাবার পাবেন, নয়তো চন্দনেশ্বরে খেতে পারেন তবে পছন্দ নাও হতে পারে। তখন সকাল আটটা, ভালো প্রাতরাশ করে বেড়িয়েছি, খাওয়ার চিন্তা কে করে?
একটু এগিয়ে দেখলাম রাস্তার ডানদিকে কয়েকটি কুঁড়ে, বাদিকে একটি একচালা চায়ের দোকান আর একটি লোক কিছু বাদাম, পাপরি ইত্যাদি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, তার পিছনে একটা ফাঁকা ফাঁকা জঙ্গলের মত জায়গায় একটি নির্মিয়মান একতলা বিল্ডিং, জানলাম এটি ভবিষ্যতে সরকারি গেস্টহাউস হবে। চায়ের দোকানে কয়েকটি লোক চা খাচ্ছে, কয়েকটি বাচ্চা ওই বাদামওয়ালার চারিদিকে ঘুর ঘুর করছে। গলা তখন শুকিয়ে গেছে, সাথে থাকা জল খেতেই, চায়ের নেশা জাগলো। নিলাম, এক চুমুক দিয়ে বুঝলাম এটা যে চা সেটা আগে বলে দিতে হবে। এরপর আর অপেক্ষা না করে জলের দিকে এগিয়ে গেলাম, সাদা মিহি বালির তট, অনেকটা যেন নদীর পাড়। চড়া রোদ উঠেছে, তটের ওপর অনেকগুলো কালো কালো নৌকো উল্টে রাখা আছে, তাতে কিছু লোক কাজ করছে, কিছু ওই নৌকার আড়ালে বসে তাস খেলছে। জলরাশি যথেষ্ট স্থির, প্রায় লেকের মত, দুদিকে দিগন্তরেখা, দিঘার দিকে বিশাল সমুদ্র, কিন্তু সোজাসুজি উলটো দিকে মোটামুটি এক কিমির কম দূরত্বে একটা তট, বিস্ময়ে লক্ষ করলাম ওই তটের রংটা লাল। লোকেদের জিজ্ঞেশ করতে উড়িয়া টানে বললো, গিয়েই দেখো। জানতে চাইলাম কি করে যাবো এত জল, বললো নৌকো আসছে, এলে যাবে।
দেখলাম একটা নৌকো এদিকেই আসছে। ইতিমধ্যে এক নববিবাহিত দম্পতি ওখানে এসে উপস্থিত, নৌকো দেখে ওরাও এগিয়ে গেছেন, দরাদরি শুরু হতে স্থির হলো আমরা চারজনই একসাথে গেলে ভাড়াটা আয়ত্তের মধ্যে থাকবে। কথা হলো সমুদ্রও ঘুরিয়ে দেবে। নৌকাটা ছোট, দুজন চালাচ্ছে, একজন দাঁড় টানছে, একজন হাল ধরে আছে। সন্দেহ হলো এই নৌকো সমুদ্রে যাবে তো? নৌকো দুলতে দুলতে এগিয়ে চললো লাল তটের দিকে, বহুদিন পর নৌকো চড়েছি, একটু যে ভয় ভয় করছে তা নয়, দুজনেই তো সাঁতার জানিনা! যাই হোক দশ মিনিটেই ওপারে পৌঁছলাম। কিন্তু যত কাছে যাচ্ছি তটটা সাদা লাগছে, কি হলো ব্যাপারটা? যার জন্য এলাম সেই লাল রঙ কই? ভেজা বালিতে নামতেই বুঝলাম একটু দূরে শুকনো বালিটা লাল। চারজনে এগোতেই বোধগম্য হলো ব্যাপারটা। ওগুলো লাল কাঁকড়া, অসংখ্য, অগুনতি, যেন একটা লাল চাদর বিছানো, ওরা রোদ পোহাচ্ছে। আমরা যত এগোই তত ওরা গর্তে ঢুকে যায় আর আমাদের চারপাশের কিছুটা অঞ্চল সাদা বালি হয়ে যাচ্ছে। পেছন দিকে আবার সেই লাল। সামনে, পেছনে, দুধারে শুধু লাল। আমদের চারজন কে ঘিরে একটা ছোট্ট সাদা বালির দ্বীপ আর তার চারিদিকে লাল রঙ। মনে হচ্ছে স্বপ্ন দেখছি। কিছুক্ষন পর ধাতস্থ হতে দেখি একটু দূরে কিছু বাচ্চা খেলা করছে। একটু এগোতে দেখি কয়েকজন মাটিতে উবু হয়ে বসে কি করছে। কাছে যেতে বুঝলাম কাঁকড়া ধরছে। একটা কাঠি গর্ত দিয়ে ঢুকিয়ে রেখে দিচ্ছে, কয়েক মিনিট পর খুব আসতে আসতে তুলছে, কাঠির ডগায় একটা কাঁকড়া, খপ করে ধরে কয়েকটা ঢাকনা ওয়ালা ছোট্ট ঝুড়িতে ভরে ফেলছে। ওদেরকে দেখে আমরাও চেষ্টা করলাম। ধুস্ ! কাঁকরাগুলো বোধহয় চেনা লোক ছাড়া ধরা দেয় না। তবু আমাদের সাথের ভদ্রলোকের অনুরোধে ওরা একটাকে ওনার হাতের তালুতে রাখলো। ভালো করে দেখলাম, ছবিও তুললাম। আরো একটু এদিক ওদিক ঘুরতে ঘুরতে, থুড়ি ওই লাল কাঁকড়া তাড়াতে তাড়াতে দেখলাম অনেক বড় বড় কাছিম জল থেকে উঠে এসে রোড পোহাচ্ছে, আমরা এগোতেই ওগুলো প্রায় সব জলে নেবে গেল, শুধু একটা রয়ে গেল, উৎসাহ ভরে এগিয়ে গিয়ে দেখি ওটি মরা আর উল্টানো, বাচ্চাগুলো আমাদের সাথে সাথেই প্রায় আসছিল, ওরাই উড়িয়াতে বললো, ওভাবেই ওরা কাছিমগুলোকে উল্টে রাখে, তারপর পরে নিয়ে যায়, তবে ওই দিনে একটা দুটোর বেশি নয়। কেন জিজ্ঞেস করায় বললো, তার বেশি হলে যদি কাছিম আর না আসে তাই। ওদের পরিমিত ভাবে প্রকৃতির সম্পদ আরোহনের ভাবনা আমাদের অবাক করলো।
এবার সমুদ্রে যাবার পালা। নৌকোয় উঠতেই তা দিঘার দিকে ভেসে চললো। কিছু দূর অবধি আগের মতোই অল্প দুলুনি, সামনে নীলচে ধূসর অসীম জলরাশি। কিছুটা এগোতেই ঢেউয়ের উপলব্ধি হলো। প্রথমে দুলুনি বাড়ল, তারপর আরো কিছুটা এগোতেই নৌকো যেন মোচার খোল হয়ে গেল। সে কি দুলুনি। অত ছোট্ট নৌকা সমুদ্রের মাঝে! তাতে আমরা! নাগরদোলা কে মনে হচ্ছিল শিশু। এর মধ্যে বেশ হাওয়া উঠলো, অবস্থা সঙ্গীন। হাওয়া আর ঢেউয়ের শব্দে কথাই শোনা যাচ্ছে না। আমাদের তো ভয় প্রাণ ওষ্ঠাগত। মাঝি দুজন দেখলাম নির্বিকার। কে জানে বাবা এদের কি বোধ নেই নাকি! এর মধ্যেই হাতের ইশারায় দূরে নিউ দিঘার তট দেখালো আমাদের। কত লোক স্নান করছে, সব ছোট্ট ছোট্ট দেখা যাচ্ছে। সবচেয়ে দূরে যারা এগিয়ে এসেছে তাদের থেকেও আমরা বোধহয় অনন্ত দু-তিন কিমি দূরে নৌকায় রয়েছি। তার থেকেও কিছু এগিয়ে ওল্ড দিঘার পাথর গুলো দেখা গেল। ওপরের বাড়ি গুলো মনে হচ্ছে ঝুলনের খেলনার থেকেও ছোট। তখন আমাদের মনে হচ্ছে, ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি। কোনমতে আমাদের অনুরোধ আর ওই নববিবাহিত মহিলাটির কান্নায় তারা অনিচ্ছা সত্ত্বেও ফিরতে শুরু করলো। বললো আর একটু এগোলে নাকি দিঘা মোহনাও দেখিয়ে দিত। আমরা তখন পারলে উড়ে ফিরে আসি।
অবশেষে আবার সেই তালসারির বালু তটে এসে পৌঁছলাম। নেমেই ধাতস্থ হবার জন্য ওই চায়ের দোকানে এসে বসলাম। ইতিমধ্যে মেঘ করে ঝিরি ঝিরি বৃষ্টিও শুরু হয়েছে। ভাগ্যিস আমরা জোর করে ফিরেছি, ওই খোলা নৌকোয় সমুদ্রের মাঝে থাকা অবস্থায় জোরে বৃষ্টি নামলে হয়েছিল আরকি। অবশ্য ঘড়ি দেখে বুঝলাম মাত্র আধঘন্টা আমরা সমুদ্রে ছিলাম, তার বেশির ভাগটাই প্রায় শান্ত অংশে। দোকানে তখন এক জনই খদ্দের ছিলেন। বাংলা বলতে পারেন, মনে হলো শিক্ষিত। তার কাছে জায়গাটার সম্বন্ধে জানলাম যে এটি হলো সুবর্নরেখা নদীর বদ্বীপের পূর্বদিকের অন্তিম অংশ। ওই সামনের তটটি তার বদ্বীপের চড়া। আর দিঘার উল্টোদিকে মানে পশ্চিম দিকে সুবর্নরেখার মোহনা। তাই এটা ঠিক সমুদ্রও নয় আবার নদীও নয়, আসলে এটা একটা খারি। তাই বোধহয় হোটেলের ছেলেটি বলেছিল, সমুদ্র কিন্তু সমুদ্র নয়। আর একটা ব্যাপার জেনে ভীষন লোভ হয়েছিল রাতে থাকতে। জানলাম রাতে ভাটার সময় খারিতে জল এত কম থাকে যে শেয়ালরা একটি বিশেষ অংশ দিয়ে ওই উল্টোদিকের তটে যায় কাঁকড়া খেতে, ওখানকার লোক চাঁদের আলোয় ওই শেয়ালদের পিছু নিয়ে ওপারে যায় কাঁকড়া ধরতে, আমরা যদি রাতে কোথাও থেকে যাই তবে আমরাও যেতে পারবো। খুব লোভ হয়েছিল, কিন্তু থাকার জায়গার অভাবে সাহস করে উঠতে পারলামনা।
ফেরার পথে চন্দনেশ্বরের মন্দির দর্শন করে আবার আসার আশা নিয়ে চলে এলাম।
পথে বন্ধুকে বললাম, মায়েদের কাছে প্রতিজ্ঞা তো মিথ্যে হয়ে গেল। সে উত্তর দিলো, কি করে? আমরা কি জলে নেমেছি? আমাদের সমুদ্রে না নামতে দিব্যি দিয়েছে, নৌকা চরতে তো বারন করেনি!
দ্বিতীয়বার আমি উদ্যোগী হয়ে নিউ দিঘা থেকে দুটি রিকশায় করে মা বাবা স্ত্রী ও শিশুকন্যাকে নিয়ে তালসারি যাই তিন সালে। দেখলাম ওই কুঁড়ে গুলো নেই, দোকানটা একটু বড় হয়েছে, নির্মিয়মান গেস্ট হাউসটি ভগ্নপ্রায়। কুঁড়ে গুলোর জায়গায় একটা প্রচন্ড বিশ্রী পচা মাছের গন্ধ বার হওয়া একটি কারখানা। কৌতুহল বসত ভেতরে গিয়ে দেখি ওটি একটি সমুদ্রজাত প্রাণী থেকে পোল্ট্রির খাদ্য প্রক্রিয়াকরণের উদ্যোগ। তটে বেশি নৌকো নেই। উল্টোদিকের তটের রঙও সাদা। দূরে কিছু জেলে জাল কাঁধে সারি দিয়ে ওই খারি হেঁটে পার হচ্ছে দেখে আমার ষাটোর্ধ বাবা তরুণের মত দৌড়ে গেলেন তাদের উদ্দেশ্যে। কিন্তু ভগ্ন হৃদয়ে ফিরে এসে জানালেন, মাছের খোঁজে গেছিলেন, কিন্তু ওরা যাচ্ছে ওই তটে জাল শুকোতে। ওই অংশে জল হাঁটুর নিচেই ছিল। হয়তো ঐটাই সেই শেয়াল পার হবার রাস্তা। নাঃ এবার আর নৌকা চড়ার সুযোগ বা ইচ্ছে কোনোটাই হয়নি। জানলাম উড়িষ্যার সেই প্রচন্ড ঘূর্ণি ঝড়ে এই জায়গাটা প্রায় ধংস স্তূপে পরিণত হয়েছিল। তারপর থেকে খারির জলও কমে গেছে। মনটা বেশ খারাপ হয়ে গেল। ওই কারখানা থেকে আসা গন্ধের জ্বালায় আর থাকতেও ইচ্ছে করল না। দেখলাম আরো কিছু ভ্রমনার্থী এসেছে, কিন্তু তাদের মধ্যে যেন সেই উৎসাহ নেই। হয়তো ওদেরও পরিবেশটা আকর্ষণ করছে না।
তৃতীয়বার যাই এগারো সালে গাড়িতে করে আরো দুই বন্ধু পরিবার নিয়ে তাদেরই উৎসাহে। রাস্তায় লক্ষ্য করলাম পথের দুধারে দুই রাজ্যের মোবাইল টাওয়ার ধরছে। একটু উড়িষ্যার দিকে গেলেই রোমিং হয়ে যাচ্ছে। যখন পৌঁছলাম জায়গাটা চিনতেই পারলাম না। ওই কারখানা, দোকান, ভগ্ন গেস্টহাউস কিছুই নেই। খারিতে জল প্রায় নেই বললেই চলে। এদিকের তটে একটা বেশ বড় কংক্রিটের সামিয়ানা নির্মিত হয়েছে। তাতে অনেকগুলো মোটরসাইকেল রাখা আছে। প্রচুর লোক ওই গাড়িগুলো ভাড়া করে তটের ওপর বিকট আওয়াজ করে চালিয়ে কি মজা পাচ্ছে কে জানে! চলে আসতে ইচ্ছে করছিল। কিন্তু বন্ধুদের চাপে ওই নালার মত খারি হেঁটে পার হয়ে ওপারের তটে গেলাম। জায়গাটা থেকে পচা মাছের বিশ্রী গন্ধ আসছে। এগিয়ে গিয়ে দেখি বিস্তীর্ণ জায়গা জুড়ে মাছ শুকোনো হচ্ছে। জানলাম লাল কাঁকড়া বা কাছিম আর বিশেষ দেখা যায় না। অঞ্চলটা এত নোংরা যে বিরক্ত হয়ে জোর করেই ফিরে চললাম। ঠিক করেছি এই শেষ, আর যাবো না।
(#অমিতাভ)
Comments
Post a Comment