নছ_গোল্লা

অনেকদিন কোনো বিষয় নিয়ে প্রবন্ধ লিখিনি। তাই এটা একটা মিষ্টি প্রচেষ্টা। যদিও এখানে আসলে আমারই একটি পুরোনো লেখাকে আরো পাক দিয়ে তার মিষ্টত্ব বৃদ্ধি করা হয়েছে।

#নছ_গোল্লা

#অমিতাভ_ব্যানার্জী

   খুব ছোট তখন আমি, এই বছর তিনেকের আশেপাশে হব। জেঠু জেঠি আমার দুই দিদিকে নিয়ে কলকাতা থেকে এসেছেন দুর্গাপুরে, সবাই একসাথে শান্তিনিকেতন যাবো তার পরদিন ভোরে(পরে জেনেছি)। আবছা মনে পড়ে, একটা বিরাট বড় হাড়িতে বাগবাজারের (আন্দাজ করছি কারন জেঠুকে চিরকাল ওখানকার রসগোল্লার কথাই বলতে শুনেছি) রসগোল্লা রাখা রয়েছে, আর আমি ভর সন্ধেবেলা তার থেকে একটা একটা করে "নছ" তুলে খেয়ে চলেছি। হঠাৎ ছোড়দি না এলে হয়তো শেষই করে ফেলতাম। যথারীতি, পরদিন সারা শান্তিনিকেতনে যত শৌচালয় ছিল সব গুলোতেই স্মৃতিচিহ্ন রেখে আসতে সফল হয়েছিলাম। সেই আমার "নছ"র প্রতি প্রথম প্রেম আর তার থেকে চরম বিরহ।

    হায়ার সেকেন্ডারি বা কলেজে পড়ার সময় কালনার কাকার বাড়ি যেতে গিয়ে ধাত্রীগ্রামের রসগোল্লা আমার দ্বিতীয় প্রেম, যদিও তার পাশাপাশি বর্ধমানে কলেজে পড়তে পড়তে সেখানের রসগোল্লার সাথেও ডেটিং করেছি। কিন্তু সে দুজনের সাথে সম্পর্ক বেশিদিন টানতে পারলামনা।

    চাকরি জীবনে স্ত্রী কন্যাকে নিয়ে বার কয়েক আমার প্রথম প্রেমের সাথে পরিচয় করাতে বাগবাজারে নিয়ে গেলেও তারা ওই "কে সি দাস", "গাঙ্গুরাম", কিংবা হালের "হলদিরাম" ইত্যাদিতেই বেশি মুগ্ধ। তবে ওই সাদা রসগোল্লাকে গুড় সহযোগে লাল করে যদিও বা স্রেফ শীতের বান্ধবী হিসেবে ভালোই লাগে, কিন্তু  কমলা, আম, আনারসের রসগোল্লার সাথে "ওয়ান নাইট স্টে"র বেশি আর চলে না। এখন তো শুনি ফুচকা বা মশলার রসগোল্লাও এসেছে, জানিনা সেগুলোর সাথে আদৌ সম্পর্ক করা যায় কিনা!

     আসলে এই রসগোল্লার সাথে পরকীয়া ব্যাপারটা আজও চালাতে পারছি কারন সৌভাগ্যবসতঃ আমার রক্তে মধু এখনো ঠিকঠাকই আছে। যাদের নেই তাদের জন্য আমার বড়ই আফসোস হয়। বাংলার এই রসগোল্লা নিয়ে একটু আলোচনার আগে অতিমধুর সেই মানুষদের বিধিবদ্ধ সতর্ক করতে চাই। তাদের যদি এই লেখা ভালো না লাগে তবে যেন তারা অন্তত চারটি রসগোল্লা খেয়ে তারপর রক্ত পরীক্ষা করান। সেই রিপোর্টই তাদের এই লেখা ভালো না লাগার কারন বলে দেবে।

   "বাংলার" মানে কি যা বঙ্গে সৃষ্ট নাকি যা বঙ্গে খ্যাত। আমাদের রোজকার জনপ্রিয় অনেককিছুই বাংলার নয় কিন্তু তাদের ছাড়া আমরা বাংলাকে ভাবতেই পারিনা, তারাই এখন বাংলার বিশেষত্ব। যেমন, কলকাতার ট্রাম কি বাংলার? কলকাতার বিরিয়ানি তাও কি বাংলার? এমনকি বাঙালির "দী-পু-দা" র মধ্যে "পু" তো বাংলার নয়ই, "দা" ও পুরোপুরি বাংলার নয়। এই যে দুর্গাপূজা নিয়ে এতো মাতামাতি, তাও নাকি রামচন্দ্রের অকাল বোধনের অনুসরণ। দীপাবলী বা হোলি বা ঈদ বা খ্রিস্টমাস, তাও তো ঠিক বাংলার নয়। এই যে ফুটবল নিয়ে বাঙালি পাগল, তাও কি আদতে বাংলার?

    এই রকম আরো হাজার হাজার বিষয় আছে যাদের বাংলায় জন্ম নয় কিন্তু আমরা তা ভুলেই গেছি। এদেরকে আমরা বাংলার বিশেষত্ব বলেই মনে করি। এই যেমন আলু বা চা-ও বাংলার নয়, ঠিক তেমনই দুধের ছানাও বাংলার নয়। কিন্তু ছানা থেকে সৃষ্ট প্রায় সব মিষ্টিই বাংলার। জিওগ্রাফিকাল ইন্ডিকাশন পাওয়ার পর বাংলার রসগোল্লাকে নিয়ে যে বিতর্ক চলছে, তার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটও এই ছানাই। নবীন চন্দ্র দাসের আবিষ্কৃত এই অমৃতটির সাথে পুরীর জগন্নাথদেবের প্রসাদের নামের মিলই এই বিতর্কের বীজ।

     বাঙালির জিভে জল আনা বাংলার রসগোল্লা কেবলমাত্র "রসগোল্লা" নামের ওপর সার্টিফিকেট পায়নি, "বাংলার রসগোল্লা" নামের জন্য পেয়েছে। তাই ওডিসার  "পহল-রসোগোলার" জন্য এখনও ওডিসার সুযোগ রয়েছে। "পহল" হলো ভুবনেশ্বর এর কাছের একটি গ্রামের নাম, যেখান থেকে এই মিষ্টিটির জন্ম বলে মনে করা হয়।

     দুটির কাঁচামাল, রঙ, আকৃতি, স্বাদ এবং অন্যান্য উপাদানগুলির মধ্যে অনেক পার্থক্য রয়েছে। বাংলার রসগোল্লার মূল উপাদান ছানা, আর ওডিসার "পহল রসোগোলা" বানাতে লাগে ক্ষীর। ছানার ইংরেজি নিয়ে বিভিন্ন মত থাকলেও এটা নিশ্চিত যে ছানা কটেজ চীজ নয়, কটেজ চীজ হলো পনির, ছানা হলো কার্ড চীজ বা পট চীজ, শুকোনোর পরিমাপ অনুযায়ী।

    এদিকে ওডিসার "পহল রসোগোলা"র সাথে আমাদের বাংলারই আরেকটি বিখ্যাত মিষ্টি ক্ষীরমোহনের যথেষ্ট মিল রয়েছে। প্রথমে নাকি "পহল রসোগোলা"কে "ক্ষীরমোহন" নামেই ডাকা হত, পরবর্তী কালে তা "রসোগোলা" নাম পায়। ক্ষীরমোহনকে যথোপযুক্তভাবে পূর্ব ভারতে "ক্ষীর" যুক্ত করেই নামকরণ করা হয় কারন তা বাংলা ভাষায় যাকে "ক্ষীর" বলে তাই দিয়ে তৈরি। প্রসঙ্গত উত্তরভারতে পূর্বভারতের ক্ষীরকে বলে "খোয়া", আর উত্তরভারতের "ক্ষীর"কে পূর্ব ভারতে বলে "পায়েস বা পায়েসান্ন"। তাই রেসিপি অনুসারে পূর্ব ভারতে বিশেষত বাংলায় ক্ষীর যুক্ত করে ক্ষীরমোহন মিষ্টির নামটা বোধহয় ঠিকই আছে।

    সাধারনতঃ পর্তুগিজদের আগমনের সাথেই ছানাকে যুক্ত করা হয় কিন্তু ইতিহাস থেকে যেটুকু জানা যায় তা হলো পর্তুগিজরা নয় বরং ডাচদের দ্বারাই ছানার আগমন ঘটেছিল। পর্তুগিজরা ১৫১৮ খ্রিস্টাব্দে পূর্ব ভারতে আসে এবং ১৬১৫ সালে ডাচরা আসে পর্তুগিজদের প্রায় ১০০ বছর পর। এদিকে ইতিহাস বলে ১৫/১৬শতকে মানে ইউরোপিয়ানরা আসার সমসাময়িক কালে বলরাম দাস ওডিয়াতে রামায়ন লেখেন, তিনি নাকি আসল রামায়ন পড়েননি, শুধু গল্প শুনে তা ভাবানুবাদ করেন, হয়তো সেই কারণেই বা যখন ১৮৪৮ সালে ওডিয়াতে রামায়ন প্রকাশিত হয় তখন, তাকে সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য ও জনপ্রিয় করে তুলতে গিয়ে এটির তৎকালীন রচয়িতা বা প্রকাশককে সহজে পাঠকদের কাছে পৌঁছবার জন্য এমন বিষয়ের সাহায্য নিতে হয়েছিল যা দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত এবং যা ঐতিহ্যগতভাবে সংসারের একটি সাধারণ উপাদান হয়ে গেছে (ওডিয়া রামায়ন প্রকাশের ২০০ বছরেরও বেশি সময় আগে ডাচরা প্রবেশ করে ফলে দুধের ছানা নিশ্চয়ই ততদিনে একটি সাধারণ খাদ্য হয়ে গেছিল)। সুতরাং ওডিয়া রামায়নে স্বাভাবিক ভাবেই ছানাকে আঞ্চলিক খাদ্য হিসেবে দেখানো হয়েছে। ব্যাস, তাতেই রসোগোলা একরকম পৌরাণিক সার্টিফিকেট পেয়ে যায়, কারন ওডিসার তখনকার সাধারণ মানুষ ওই সংস্কৃত রামায়নের চেয়ে এই মাতৃভাষার রাময়নকেই স্বভাবিক ভাবেই বেশি বিশ্বাসযোগ্য মনে করেছিল।

      এই কথাটা কিন্তু বলা যায়, ছানা নিশ্চিত বিদেশী, কারণ এটি ভারতের বাকি অংশে পূজা প্রসাদ হিসাবে ব্যবহার করা হয় না শুধুমাত্র পূর্ব ভারতে বিশেষ করে বাংলায় এটি ব্যবহার করা হয় প্রসাদে, অবশিষ্ট ভারত খোয়াকে (যা পূর্ব ভারতে বিশেষ করে বাংলা ভাষায় ক্ষীর হিসেবে পরিচিত) পুজোয় ব্যবহার করে, কারণ উত্তর ভারতে ছানাকে বলা হয় অশুচি কারন এটি বানাতে দুধকে "কাটা" হয় লেবুর রস (বা কোনো ভোজ্য অ্যাসিড) দ্বারা প্রতিক্রিয়া করিয়ে, তাই এটি অপবিত্র। সুতরাং এই বিদেশি ছানার থেকে সৃষ্ট রসগোল্লা সাবেকি মতে পুজোয় ব্যবহারযোগ্য নয়। এদিকে ওডিসার ক্ষীরের রসোগোলা কিন্তু জগন্নাথদেবের পুজোর প্রসাদ।

    তাই "ওডিসার রসোগোলা" আর "বাংলার রসগোল্লা"র মধ্যে নামের মিল থাকলেও ঐতিহাসিকভাবে বা চরিত্রগতভাবে বা উপদানগতভাবে যেভাবেই হোক বিশেষ কোনো মিলই নেই, শুধু মাত্র দুটোই  দুগ্ধজাত মিষ্টান্ন এই বিষয়টি ছাড়া। সুতরাং ওডিসার অবশ্যই এখনো সুযোগ আছে তার "পহল রসোগোলার" জন্য আলাদা সার্টিফিকেট পাবার।

     এদিকে বাঙালিদের বলতে পারি, তারা যেন তাদের রসগোল্লার প্রতি প্রেম নিদ্বিধায় চালিয়ে যান। কারন প্রেম কখনোই প্রেমিক প্রেমিকার জন্মের দেশকাল হিসেব করে হয়না জিগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন থাক বা না থাক রসগোল্লার ইতিহাস জানার থেকে তাকে বরং "বাংলার স্বাদ" বলে মেনে নেওয়া সারা পৃথিবীর আপামর বাঙালির কাছে অনেক বেশি মিষ্টির।
আমি তো অন্তত রসগোল্লা সামনে থাকলে সংসারের অন্য কোনো চিন্তা মাথাতেই আনতে পারিনা। আমি নিজে তো আজও সুযোগ পেলে খান ছয়েক রসগোল্লা দিয়ে জলখাবার সেরে ফেলি, কিন্তু আমার ভাই বা দাদাদের রসগোল্লা প্রেমের কাছে আমি নেহাৎই টেনিয়া, তারা দশ থেকে গুনতে শুরু করেন।

    পরিশেষে, সেই ডাক্তার কাকু, যাকে ছোটবেলায় দেখেছিলাম বিয়েবাড়ির কলাপাতায় পুরো এক বালতি রসগোল্লা ঢেলে নিয়ে পুরোটা সাবরে দিতে, যিনি নাকি গুনে রসগোল্লা খেতেন না, আমার সেই গুরুদেবকে স্মরণ করে এই মিষ্টি লেখাটা শেষ করছি।

      পুনঃ:- পারবে? অন্য কোনো রাজ্যের হঠাৎ নাম হওয়া, কোনো মিষ্টি আমাদের বাংলার এই রসগোল্লা প্রেমের সাথে পাঙ্গা নিতে? একরকম নাম হলেই কি একরকম গুণ হবে নাকি? তাহলে তো রবীন্দ্রনাথ নাম দিলেই যে কেউ বিশ্বকবি বা কবিগুরু হয়ে যেত। তাকে কি নামের মিলের জন্য নোবেল দেওয়া হতো?

(#অমিতাভ)

Comments

Popular posts from this blog

বাংলার বিভিন্ন ধরনের ভুত

মহাভারত একটু অন্য চোখে - কৌরবদের ১০২ জন কিকরে?

মহাভারত একটু অন্য চোখে - কৌরবদের ১০২ জন কারা?